ঢাকা, ||

বিদ্যুতের খুঁটিতে বসবে বজ্র নিরোধক


বিশেষ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ১২:৪৪ অপরাহ্ন, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮

>> চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৬ জন
>> পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে বাড়ছে বজ্রপাত
>> প্রযুক্তির প্রসার ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বেশি দায়ী
>> হাওর বা খোলা এলাকায় সেল্টার নির্মাণের সিদ্ধান্ত
>> ভেনিজুয়েলার মারাকাইবো লেকে ৩০০ দিনই বজ্রপাত

চলতি বছর এখন পর্যন্ত (১৪ সেপ্টেম্বর) বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৬ জন। সর্বশেষ গত মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার মারা গেছেন ১৮ জন। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর মধ্যে পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে বজ্রপাত বেড়েছে।

এদিকে বজ্রপাতে মৃত্যুহার কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা (লাইটনিং অ্যারেস্টার) বসাতে চিঠি দেয়া হয়েছে। এটা হলে উঁচু খুঁটিগুলো বজ্রপাত টেনে নেবে। এতে মৃত্যুহার কমে যাবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাইয়ের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

গত শুক্রবার বজ্রপাতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও ময়মনসিংহের নান্দাইলে একজন করে মারা যান। বুধবার আট জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যু হয় ১০ জনের। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ ও সাতক্ষীরায় দুজন করে চারজন মারা যান। অন্য পাঁচজনের মৃত্যু হয় গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, বাগেরহাট, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীতে। মঙ্গলবার মাগুরায় বিলে পাট কাটার সময় একসঙ্গে মারা যান চার কৃষক।

সম্প্রতি বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্ষার সময় বজ্রপাত হয়। এটা স্বাভাবিক। গত কয়েক দিন পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে। বর্ষার সময় পশ্চিমা লঘুচাপ একটু বেশি হয়।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণত বর্ষার আগ মুহূর্তে অর্থাৎ মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাত হয়। বর্ষাকালেও মাঝে মাঝে বজ্রপাত হয়।’

কেন বজ্রপাত হয়- এই প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা জানান, সাদা মেঘের উপাদানের অধিকাংশই জলীয়বাষ্প বা পানির কণা হয়। ফলে সাদা মেঘের মধ্যে ঘর্ষণে বা সংঘর্ষের ফলে যথেষ্ট ইলেকট্রন সৃষ্টি হয় না। কিন্তু কালো মেঘে নাইট্রোজেন ও সালফার গোত্রের গ্যাসের পরিমাণ বেশি থাকায় দ্রুতগতির কারণে এসব যৌগিক গ্যাসের মধ্যে সংঘর্ষে প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রনের সৃষ্টি হয়। এসব ইলেকট্রন বাতাসের জলীয়বাষ্পের মাধ্যমে ভূমিতে চলে আসে এবং সৃষ্টি হয় বজ্রপাত।

বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ায় বিষয়ে বাংলাদেশে কোনো গবেষণা না থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বাতাসে কার্বনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বজ্রপাত বেড়েছে।

চলতি বছর মার্চ-এপ্রিলে ৭০ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। এর মধ্যে ২৯ ও ৩০ এপ্রিল দুদিনে ২৯ জন মারা যান। ওই মাসে মোট মারা যান ৫৮ জন। মার্চ মাসে বজ্রপাতে ১২ জন মারা যান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোহসীন এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বজ্রপাতে বেশি মানুষ মারা যাওয়ায় অন্যতম একটি কারণ হলো মানুষের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া।’

বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বজ্রপাত উঁচু স্থানে প্রথম আঘাত হানে। এজন্য আমাদের তালগাছ রোপণ কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে ৩১ লাখ তালগাছ রোপণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম চলবে। যদিও এ কর্মসূচির ফল পেতে একটু সময় লাগবে।’

অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘সারাদেশের বিদ্যুতের খুঁটিগুলোতে লাইটনিং অ্যারেস্টার লাগাতে আমরা বিদ্যুৎ বিভাগকে বলেছি। ইতোমধ্যে তাদের চিঠি দিয়েছি। এটি হলে একটি বড় কাজ হবে। দেশের শহর-গ্রাম প্রায় সব জায়গাতে ইলেকট্রিক পোল রয়েছে। আমরা বলেছি, যত বিদ্যুতের খুঁটি আছে, সবগুলোতে যেন লাগানো হয়। এটা একটি বড় সিদ্ধান্ত এবং এর বাস্তবায়ন আমাদের করতে হবে। উই আর ট্রাইং।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আহমেদ কায়কাউস জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারগুলোতে লাইটনিং অ্যারেস্টার থাকে। বিদ্যুতের সব পোলে অ্যারেস্টার লাগানোর বিষয়টি টেকনিক্যাল লোকজনকে দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। জাতীয়ভাবে যদি এটার গুরুত্ব থাকে তবে তো আমরা এটা অবশ্যই করবো।’

অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে বাড়ি নির্মাণের সময় বজ্র নিরোধক দণ্ড ব্যবহার করা হচ্ছে না। নতুন যে বিল্ডিং কোড হচ্ছে সেখানে এটা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বিল্ডিং কোডটি সংশোধন করছে।’

‘বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হাওর বা খোলা এলাকায় সেল্টার নির্মাণের সিদ্ধান্ত রয়েছে আমাদের। কারণ হঠাৎ বজ্রবৃষ্টি শুরু হলে হাওরে কাজ করা লোকজনের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বেশ সময় লাগে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলো করা হবে যাতে গরু-ছাগলসহ দ্রুত মানুষ নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারে। এজন্য একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন আছে’- যোগ করেন অতিরিক্ত সচিব।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতে মোট মারা গেছেন ২৫৪ জন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বজ্রপাতে মোট ৩০৭ জন মারা যান। এছাড়া বজ্রপাতে ২০১৬ সালে ৩৮০, ২০১৫ সালে ২১৯, ২০১৪ সালে ২১০, ২০১৩ সালে ২৮৫, ২০১২ সালে ৩০১ এবং ২০১১ সালে ১৭৯ জনের প্রাণহানী ঘটে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যে দেখা গেছে, বছরে এক কোটি মানুষের মধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারতে একজন, বাংলাদেশে নয়, নেপালে ২৪, শ্রীলংকায় ২৭ জন বজ্রপাতে মারা যান। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বছরে বজ্রপাতে মৃত্যুহার প্রতি কোটিতে চার জনেরও কম।

বিশ্বে বছরে প্রায় দুই হাজার থেকে ২৪ হাজার লোক বজ্রপাতে মারা যান এবং প্রায় দুই লাখ ৪০ হাজার লোক আহত হন। পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০ বার বজ্রপাত হয় অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ বার বজ্রপাত হয় বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বজ্রপাতে সারাবিশ্বে বছরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ডলার। সবেচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় ভেনিজুয়েলার মারাকাইবো লেকে। সেখানে বছরে গড়ে ৩০০ দিন বজ্রপাত হয়।

বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকতে

>>এপ্রিল-জুন মাসে বজ্রবৃষ্টি বেশি হয়, বজ্রপাতের সময়সীমা সাধারণত ৩০-৪৫ মিনিট স্থায়ী হয়। এ সময়টুকু ঘরে অবস্থান করুন।

>>ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে ঘর থেকে বের হবেন না, অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে বের হতে পারেন।

>>বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, খোলা মাঠ অথবা উঁচু স্থানে থাকবেন না।

>>বজ্রপাতের সময় ধানক্ষেত বা খোলা মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি পায়ের আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙ্গুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকুন।

>>যতদ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন। টিনের চালা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।

>>উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার বা ধাতব খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকুন।

>>কালো মেঘ দেখা দিলে নদী, পুকুর, ডোবা বা জলাশয় থেকে দূরে থাকুন।

>>বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতর অবস্থান করলে গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ ঘটাবেন না, সম্ভব হলে গাড়িটি নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন।

>>বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি ও বারান্দায় থাকবেন না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং ঘরের ভেতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকুন।

>>বজ্রপাতের সময় মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ল্যান্ডফোন, টিভি, ফ্রিজসহ সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন এবং এগুলো বন্ধ রাখুন।

>>বজ্রপাতের সময় ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করবেন না। জরুরি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করতে পারবেন।

>>বজ্রপাতের সময় শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন এবং নিজেরাও বিরত থাকুন।

>>বজ্রপাতের সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে যাবেন না, তবে এ সময় সমুদ্র বা নদীতে থাকলে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করুন।

>>বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। প্রতিটি বিল্ডিং-এ বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন নিশ্চিত করুন।

>>খোলাস্থানে অনেকে একত্রে থাকাকালীন বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে দূরে সরে যান।

>>কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যান।

>>বজ্রপাতে কেউ আহত হলে বৈদ্যুতিক শকে আহতদের মতো করেই চিকিৎসা করতে হবে। প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসককে ডাকতে হবে বা হাসপাতালে নিতে হবে। আহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

Top