ঢাকা, ||

‘তুমি আর বিদেশে যাইবা না, তোমারে আর বিদেশে যাইতে দিব না।’ -অশ্রুমধুর মিলন


জাতীয়

প্রকাশিত: ৭:৫০ পূর্বাহ্ন, এপ্রিল ৭, ২০১৫

দেশে ফিরে ফুটফুটে সন্তান দুটিকে বুকে জড়িয়ে আছেন আনোয়ার হোসেন

দেশে ফিরে ফুটফুটে সন্তান দুটিকে বুকে জড়িয়ে আছেন আনোয়ার হোসেন

ফ্লাইট নেমেছে বিকেল সোয়া ৫টায়। ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে প্রায় ২৫ মিনিট পর লাগেজ হাতে জামালপুরের হেলাল উদ্দিন এলেন ক্যানোপি এরিয়ায়। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাছে দ্রুত ছুটে যায় তাঁরই নবম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে রুবেল। হেলাল উদ্দিনের গলা জড়িয়ে ধরে রুবেল বলতে থাকে, ‘তুমি আর বিদেশে যাইবা না, তোমারে আর বিদেশে যাইতে দিব না।’ গলা জড়িয়ে ধরা অবস্থায় ছেলেকে নিয়েই দ্রুত গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি। যেন এক ফ্লাইট ছেড়ে আরেক ফ্লাইট ধরার ব্যস্ততা!

কালের কণ্ঠের ফটো সাংবাদিক শেখ হাসান এগিয়ে যান ছবি তুলতে। হেলাল উদ্দিন বাধা দেন। বলেন, ‘ভাই, ছবি তুলবেন না, সমস্যা হইতে পারে।’ শেখ হাসান জানতে চান, ‘কী সমস্যা? আপনি এখন লিবিয়ায় নয়, বাংলাদেশে এসেছেন। তার পরও ভয় কেন?’ হেলাল উদ্দিন আমতা আমতা করে বলেন, ‘কিছুই বলা যাবে না, পত্রিকায় ছবি আসলে সমস্যা হইতে পারে।’ এরপর দ্রুতই গাড়িতে উঠে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন হেলাল উদ্দিন।

লিবিয়ায় অপহরণকারীদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে গতকাল বিকেলে একই ফ্লাইটে দেশে ফেরা নোয়াখালীর আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তাঁর পরিবারের পুনর্মিলনটা আরো চমকপ্রদ। আনোয়ারকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা তাঁর দুই শিশু মুমতাসিম আনোয়ার রাহিম ও নাজিয়া আনোয়ার রাইসা। এত দিন পর বাবাকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খাওয়ার সুযোগটা কোনোভাবেই যেন হাতছাড়া করতে চাচ্ছিল না অবুঝ ওই দুই সন্তান। আনোয়ার অপহৃত হওয়ার পর কঠিন সময় পার করেছেন তাঁর স্ত্রী মারুফা খাতুন। অপহরণের আগে বাবার সঙ্গে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় মোবাইল ফোনে কথা হতো রাহিম ও রাইসার। কিন্তু গত মাসের ৬ তারিখ থেকে বাবার সঙ্গে ফোনে ওদের আর কথা হয় না। ‘বাবা কেন ফোন করে না, কখন করব’- এমন অসংখ্য প্রশ্নবাণে রাহিম ও রাইসা জর্জরিত করত মা মারুফা খাতুনকে। সন্তানদের এমন প্রশ্ন শুনে নীরবে কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন মারুফা। ওদের বাবা যে অপহৃত হয়েছিল তা ঘুণাক্ষরে জানাননি সন্তানদের। অবশেষে সেই মায়ের মুখে হাসি ফুটেছে, আনন্দে আত্মহারা রাহিম ও রাইসাও। ওদের বাবার সঙ্গে মোবাইল ফোনে নয়, এখন সঙ্গে থেকে কথা বলছে তারা।

বাংলাদেশে আসার পর আনোয়ার হোসেনকে কাছে পেয়ে পরিবারের সবাই খুশিতে আত্মহারা। খুশিতে কাঁদতে থাকেন আনোয়ারের স্ত্রী মারুফা খাতুন। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি  বলেন, ‘কখনো ভাবিনি আমার স্বামীকে জীবিত ফেরত পাব। যে সংগঠনটি আমার স্বামীকে অপহরণ করে নিয়েছিল, শুনেছিলাম তাদের ভয়ংকর সব কর্মকাণ্ডের খবর। টেলিভিশন আর পত্রিকায় এসব দেখে আতঙ্কে থাকতাম। তবে শেষ পর্যন্ত ওকে দেখে সব আতঙ্ক দূর হয়ে গেছে।’

মারুফা বলেন, ‘ওদের বাবা প্রতিদিনই বিকেলে ফোন দিত, বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলত। কিন্তু অপহরণের পর থেকে ফোন না পেয়ে অস্থির হয়ে আমাকে নানা প্রশ্ন করত সন্তানরা। কিন্তু উত্তর দিতে পারতাম না। শুধু কেঁদেই বুক ভাসিয়েছি। আজ ওকে (আনোয়ার হোসেন) কাছে পেয়ে সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে। আর বিদেশ করতে (যেতে) দিব না।’

লিবিয়া থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসছেন- এমন খবর পেয়ে বিমানবন্দরে দুপুর থেকে উপস্থিত ছিল প্রবাসী মো. আনোয়ার হোসেনের দুই সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা। সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় আনোয়ার হোসেন বিমানবন্দরে বেরিয়ে আসার পরপরই দৌড়ে ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে দুই সন্তান।

সংবাদকর্মী পরিচয় দেওয়ার পর আনোয়ার হোসেন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘কথা বলা যাবে না, অনেক সমস্যা হইতে পারে।’ হেলাল উদ্দিনের মতো তাঁর চোখে-মুখেও তখন অজানা আতঙ্ক।

গত ৬ মার্চ লিবিয়ার সিরতের কাছে আল ঘানি তেলক্ষেত্রে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষীকে হত্যা করে। এরপর বিদেশিদের কাছে ওরা জানতে চায়, ‘হু আর মুসলিমস? (মুসলমান কারা?)।’ ঘটনার আকস্মিকতায় তা বুঝতে বা শুনতে পাননি দুই বাংলাদেশি আনোয়ার হোসেন ও হেলাল উদ্দিন। আলজেরীয়সহ অন্য মুসলমানরা বেঁচে গেলেও ওই দুই বাংলাদেশিসহ মোট ৯ জন বিদেশিকে অপহরণ করে মরুভূমির অনেক ভেতরে নিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা।

দু-এক দিন যেতেই যখন অস্ত্রধারীরা জানতে পারে দুই বাংলাদেশি ও এক সুদানিজ মুসলমান, তখনই বদলে যায় তাদের আচরণ। অস্ত্রধারীরা যা খেয়েছে, তাদেরও তা খেতে দিয়েছে। জানা গেছে, ওই দুই বাংলাদেশি ও এক সুদানিজের মুক্তির বিষয়টি এক রকম নিশ্চিত হয়ে যায় তাদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ হওয়ার পরই। অপহৃত হওয়ার ১৮ দিন পর গত ২৪ মার্চ তাঁদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান অস্ট্রিয়ার ভ্যালু অ্যাডেড অয়েলফিল্ড সার্ভিসেস (ভিএওএস) লিমিটেড জানায়, ওরা তিনজন মুক্তি পেয়েছে।

মুক্তি পাওয়া দুই বাংলাদেশি লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বলেছেন, অপহরণকারী ইসলামী গোষ্ঠী বলেই তাঁরা মনে করছেন। ভিএওএসও জানিয়েছিল, অপহরণকারীরা ইসলামিক স্টেটের (আইএস)। তবে তারা প্রকৃত আইএস নাকি স্বঘোষিত আইএস অনুগত গোষ্ঠী, তা স্পষ্ট নয়।

ওই দুই বাংলাদেশি মুক্তি পাওয়ার পর রাতারাতি রাজধানী ত্রিপোলিতে ফিরতে পারেননি। এক দিন রওনা হওয়ার পর সিরতে প্রবল সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় তাঁদের যাত্রা থেমে যায়। সিরতে থেকে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় মিসরাতায়। সেখানে স্থানীয় অ্যাটর্নি অফিসে যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গত ২ এপ্রিল ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে পাঠানো হয় তাঁদের।

বাংলাদেশ দূতাবাসে পৌঁছার পর রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল শহিদুল হকসহ দূতাবাস কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করেন। সেদিনই সন্ধ্যায় লিবিয়া ছেড়ে মাল্টার উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। গত রবিবার তাঁরা মাল্টা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। সর্বশেষ দুবাই থেকে এমিরেটসের ফ্লাইটযোগে গতকাল বিকেলে তাঁরা ঢাকায় পৌঁছান।

Top