ঢাকা, ||

সন্তানেরা শুধু আমার শরীরের খানিকটা ক্ষত দেখেছে, ব্যস, এটুকুই


আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ১:৪৮ পূর্বাহ্ন, এপ্রিল ৮, ২০১৫

 

 

 

Jolie Pit Family picপ্রায় এক দশক ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেছেন আমার মা। ৫৬ বছর বয়সে তিনি এই রোগের কাছে হার মানেন। মা অনেক লড়াই করে বেঁচে ছিলেন তাঁর প্রথম নাতিকে দেখার জন্য, তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করার জন্য। কিন্তু আমার অন্য সন্তানেরা সেই আদরটা পায়নি। তারা বুঝতে পারেনি তাদের নানি কতটা মমতাময়ী ছিলেন।
আমার সন্তানেরা প্রায়ই আমার কাছে তাদের ‘মায়ের মা’ সম্পর্কে গল্প শুনতে চায়। তখন আমি উপলব্ধি করি, আমার গল্পে সব সময়ই উঠে আসে একটা তুচ্ছ রোগের কাছে মাকে হারানোর ব্যঁথাটা। আমার সন্তানেরা জানতে চায়, তাদের মায়ের সঙ্গেও কি এমনটাই হবে? আমি তাদের এত ভাবতে বারণ করি। কিন্তু সত্যিটা হলো, আমার জিনেও যে সেই ত্রুটিটাই আছে, বিআরসিএ-১, যা ক্রমশই আমার স্তন ও ডিম্বাশয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, আমি ৮৭ শতাংশ স্তন ক্যানসার ও ৫০ শতাংশ ডিম্বাশয়ে ক্যানসারের ঝুঁকিতে আছি। কিছু মানুষ জিনগত ত্রুটির কারণে বংশপরম্পরায় এই রোগের ঝুঁকিতে পড়ে। যারা বংশগতভাবে বিআরসিএ-১ জিনটি ধারণ করছে, তাদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৬৫ শতাংশ।

Jolie Family pic

ছয় সন্তানের সঙ্গে জোলি, ছবি: ইউএস ম্যাগাজিন

যখন আমি এসব বিষয় জানতে পারলাম, তখন বুঝতে দেরি হলো না, এ-ই আমার বাস্তবতা। তাই একে মেনে নিয়ে নিজেকে আরও শক্ত করলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, যতটা সম্ভব আমাকে এই ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে আমি ‘ডাবল মাসটেকটমি’ করার (দ্বৈত স্তন অপসারণ) সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি স্তন দিয়েই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করলাম। কারণ, ডিম্বাশয়ের চেয়ে আমার স্তনে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকিই বেশি।
গত ২৭ এপ্রিল দীর্ঘ তিন মাসের মাসটেকটমির চিকিৎসা-প্রক্রিয়া শেষ হলো। ওই সময়টায় আমি এসব ব্যক্তিগত পর্যায়েই রাখতে চাইছিলাম। তাই নিজের কাজ স্বাভাবিক নিয়মেই চালিয়ে গেছি।
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে  এখন লিখছি কারণ,আমি আশা করি আমার এই অভিজ্ঞতা অনেক নারীর জীবন সুরক্ষিত রাখতে কাজে আসবে। প্রতিটি মানুষের কাছেই ক্যানসার এখনো এমন এক আতঙ্কের নাম, যা বোধশক্তিকে অসার করে দেয়। কিন্তু এখন একটা রক্ত পরীক্ষার মধ্যে দিয়েই জেনে নেয়া যাচ্ছে, ক্যানসারের ঝুঁকি কতটুকু। ফলে আক্রান্ত হওয়ার আগেই  প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে। আমাদের সেটাই করতে হবে।
আমার চিকিৎসা শুরু হয় মূলত ২ ফেব্রুয়ারি, ‘নিপল ডিলে’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। দুই সপ্তাহ পর আমার সবচেয়ে বড় অস্ত্রোপচারটি হয়। তখন আমার স্তনের টিস্যুগুলো অপসারণ করা হয়। এরপর সেখানে কৃত্রিম পরিপূরক দিয়ে অস্ত্রোপচার শেষ হয়। আট ঘণ্টা চলে সেই অস্ত্রোপচার। যখন জ্ঞান ফেরে তখন বুকের ওপর কতগুলো পাইপ আর নলের নড়াচড়া আবিষ্কার করি। একটা সায়েন্স ফিকশন ছবির দৃশ্যের মতো লাগে ওই সময়টায়। অস্ত্রোপচারের দিন কয়েক পরই দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনে আবার ফিরে যাই। নয় সপ্তাহ পর শেষ অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, বুকে কৃত্রিম স্তন প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে। বিগত কয়েক বছরে এই প্রতিস্থাপনের প্রযুক্তিতে অনেক অগ্রগতি এসেছে। এর ফলে দিন দিন এই প্রক্রিয়ার ফলাফল অনেক সুন্দর ও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
আমি লিখে এই বিষয়ে সব নারীকে এটাই জানাতে চাই যে, মাসটেকটমির সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ কিছু নয়। কিন্তু আমি সিদ্ধান্তটা নিতে পেরে অনেক আনন্দিত। আমার স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি এখন ৮৭ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এখন আমি আমার সন্তানদের আশ্বাস দিতে পারি—স্তন ক্যানসারে তারা তাদের মাকে হারাবে না।
এটাও খুব স্বস্তির বিষয় যে আমার সন্তানেরা আমাকে দেখে একটুও অস্বস্তিতে ভুগছে না। তারা শুধু আমার শরীরের খানিকটা ক্ষত দেখেছে, ব্যস, এটুকুই। এর বাইরে তাদের মা ঠিক আগের মতোই আছে, যেমনটা ছিল এর আগে। তারা জানে, আমি তাদের খুব ভালোবাসি।
আমি খুব সৌভাগ্যবান ব্র্যাড পিটের মতো একজন আন্তরিক আর নির্ভরশীল সঙ্গী পেয়ে। যাঁদের স্ত্রী কিংবা প্রেমিকা এ ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাঁদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই-আপনারাও এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিংক লোটাস ব্রেস্ট সেন্টারে প্রতিটি মুহূর্তে ব্র্যাড আমার পাশে উপস্থিত ছিল। এত কিছুর মধ্যেও আমরা একসঙ্গে কিছু আনন্দময় সময় খুঁজে বের করতাম, একসঙ্গে হাসতাম। আমরা জানতাম, আমাদের পরিবারের জন্য এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। আমরা জানতাম, এই পরিস্থিতি আমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে এবং এসেছেও।
আমি জেনেছি যে অনেক চিকিৎসকই অস্ত্রোপচারের বাইরে কীভাবে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো যায়, তা নিয়ে কাজ করছেন। এ বিষয়ে আমার নিজের জানা সব তথ্য আমি ‘পিংক লোটাস ব্রেস্ট সেন্টার’-এর ওয়েবসাইটে (http://pinklotusbreastcenter.com) লিখব। আশা করছি, সব নারীর জন্য সেসব তথ্য উপকারী হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর ৪ লাখ ৫৮ হাজার মানুষ মারা যায়। যেকোনো শ্রেণি, যেকোনো দেশের নারীর জন্যই জিন পরীক্ষা এবং এর পরের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপকে আরও সহজলভ্য করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রে বিআরসিএ-১ ও বিআরসিএ-২ পরীক্ষা করাতে ৩ হাজার ডলার খরচ হয়, যা এখনো অনেকের সাধ্যের বাইরে।
আমি নিজের অভিজ্ঞতাকে গোপন রাখব না বলে ঠিক করেছি। কারণ আমি জানি, এখনো অনেক নারী জানেনই না যে তাঁরা ক্যানসারের কালো একটি ছায়ার আড়ালে তিলে তিলে ঢাকা পড়তে যাচ্ছেন। আমি আশা করছি-আমার এই লেখা পড়ে তাঁরা নিজের জিন পরীক্ষা করাবেন। এতে যদি কোনো বিপদ ধরা পড়ে, তাহলে তাঁরা এ-ও জানবেন-তাঁদের হাতে সুযোগ আছে।

Top